আওয়ামীলীগের একনায়কতন্ত্র চর্চা

বিগত এক দশকের আওয়ামীলীগের শাসন আমলে দেশে তাদের একচ্ছত্র আধিপত্য দেখা গিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের কথা বলেছেন। কিন্তু একইসঙ্গে দেশজুড়ে কার্যত আওয়ামী লীগের স্বৈরাচার কায়েম করা হয়েছে। বিরোধীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। কেউ সরকারের সমালোচনা করলেই জামায়াত শিবিরের তকমা লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেই প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে তারা ক্ষমতায় এসেছে তাতে করে তারা স্বৈরাচারের ধারাবাহিকতাই রক্ষা করেছে। সর্বোপরি দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোটি ভেঙে গিয়েছে।
সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে প্রধানমন্ত্রী একচ্ছত্র ক্ষমতার চর্চা করেন৷ সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দিয়েছে৷ অন্যদিকে বেশির ভাগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ ও দুর্নীতি প্রধান সমস্যা৷ এর সঙ্গে নেতৃত্বের অযোগ্যতা ও অদক্ষতার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না এবং সর্বত্র রাজনৈতিক প্রভাব ও একনায়কতন্ত্রের সুস্পষ্ট ছাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
একটি শক্তিশালী সংসদীয় রীতির সরকারের ব্যাপারে বাংলাদেশে সাংবিধানিক ও আইনগত বাধ্যবাধকতা থাকলেও দুর্বল সংসদীয় সংস্কৃতি, নির্বাহী বিভাগের বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণ ও ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্য থাকায় সংসদীয় ধাঁচে সরকার পরিচালনার স্পৃহা ও পদ্ধতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে৷ সংসদের মতো নির্বাহী বিভাগও সরকার নিয়ন্ত্রিত। আইনসভা, নির্বাহী ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন পুরোপুরি অসমতল এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রাধান্যকৃত৷
আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে অব্যাহতভাবে রাজনৈতিকভাবে দলীয়করণ হওয়ায় বিতর্কিত নিয়োগ, পদোন্নতি, চাকরিচ্যুতি এবং বিচারকের আচরণের মাধ্যমে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সার্বিকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিচারবিভাগের পাশাপাশি জনপ্রশাসনের কর্মকর্তারাও রাজনীতিকীকরণের শিকার হয়েছেন৷ শুধু রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মকর্তাকে ক্ষমতাসীন দল ওএসডি করে রেখেছে৷ সরকারি কর্মকর্তাদের সততা ও নিয়োগের প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে৷ তাদের পদোন্নতির ব্যবস্থাও অস্বচ্ছ এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল৷
আইনের শাসন সমুন্নত রাখার পরিবর্তে সরকার ও রাজনৈতিক দলের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে পুলিশ প্রশাসন নির্বিচারে ব্যবহৃত হয়ে আসছে৷ তাদের কর্মতৎপরতায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা এবং বিচারের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ পাওয়ায় এক ধরনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির প্রসার ঘটছে৷ রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হওয়ায় নির্বাচন কমিশনও তার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠায় সফল হয়নি৷ কমিশনের সদস্যদের নির্দলীয় হওয়ার কথা থাকলেও তাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে৷
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) প্রাতিষ্ঠানিক ও রাজনৈতিক কারণে জর্জরিত, যা তার সার্বিক দক্ষতা ও কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে৷ দুদকের সমস্যা হচ্ছে দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং ক্ষমতাসীন দলের দলীয় লোকজনের বিরুদ্ধে অভিযোগের ব্যপারে কোনো কার্যক্রম গ্রহণ না করা। দুদকের মতো দুর্বল নেতৃত্ব, পেশাগত দক্ষতার অভাব এবং সরকারি সংস্থাগুলোর অসহযোগিতার কারণে তথ্য কমিশন ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না৷
ক্ষমতাসীন দল জনস্বার্থের নামে দলীয় স্বার্থের সম্প্রসারণে জনগণের সম্পদের ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে৷ রাজনৈতিক ব্যবস্থা ‘দুর্বৃত্তায়ন’ ও বাণিজ্যিকীকরণের অংশ হয়ে গেছে৷ ভয়ভীতি বা সুবিধা দেওয়ার নামে তারা অস্বচ্ছভাবে দলীয় তহবিল সংগ্রহ করে থাকে৷ আজকে গণমাধ্যম, নামেমাত্র স্বাধীন হলেও নিয়ন্ত্রণমূলক আইনি কাঠামোর কারণে অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তা, সরকারি গোপনীয়তা ও আদালত অবমাননার মতো বিভিন্ন অজুহাতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কার্যকরভাবে খর্ব করা হয়েছে৷ গণমাধ্যমের পাশাপাশি দেশের ব্যবসা খাতের আইনি কাঠামো অসামঞ্জস্যপূর্ণ৷ সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে টিকে থাকা কোন ভাবেই সম্ভব নয় এখন। তাই অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশ্নবিদ্ধ সম্পর্ক দেখা যায়৷
উল্লেখিত প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যতীত অন্যান্য সকল ক্ষেত্রেই আজ একচ্ছত্র আধিপত্য আওয়ামীলীগের। ক্ষমতার প্রাচুর্যে তারা একনায়কতন্ত্র তথা বাকশালি রাজনীতি কায়েম করেছে। কোথাও কোন স্বাধীনতা নেই। না জনগনের না কোন সরকারি, বেসরকারি বা ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের।

Leave a Reply

Your email address will not be published.